শনিবার, ৩১ মে, ২০১৪

ইলিশ ভাঁজা

 এমনি কোন এক বর্ষায় অফিস শেষে সন্ধ্যায় বাবা ফিরলেন ২ টা ইলিশ মাছ হাতে। প্রায় কাক ভেজা হয়ে। আমরা তখন সবে পড়তে বসেছি। কারেন্ট নাই। ঝড় হলে কারেন্ট থাকার প্রশ্নই উঠেনা। হারিকেনের মিট মিট আলো। একটু পর পর সলতের আঁচ বাড়াতে হয়। এ টেবিলে আমি ভাইয়া আর পিচ্ছি বোনটা। একটু পড়ি, একটু মারামারি করি। মোমবাতি থাকলে আগুনের মধ্যে দিয়ে কে কয় বার আঙ্গুল আনা নেয়া করতে পারে, সেই খেলা ও চলে। আকাশে একটু পরপর গর্জন শোনা যায়। একটু বোধ হয় বাতাস ও ছিল। আম্মা রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে মাছ দুখানা দেখলেন।
এই ভর সন্ধ্যায়, ঝড় বৃষ্টিতে মাছ কুটার ঝামেলা নেহায়েত কম হবার কথা না। আব্বা মাছ দু’খানা মায়ের হাতে ধরিয়ে দিয়েই বললেন। খুব করে ভাজত দেখি। বলেই কাপড় পালটাতে চললেন।
মায়ের রাগ তখন কে দেখে। রাগে গজ গজ করতে করতে মাছ দুখানা নিয়ে কল পারে ছুটলেন। সাথে আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন। মাথার উপর ছাতা ধরে রাখার জন্য। আম্মা মাছ ধুচ্ছেন, আর আমি লোভী বিড়ালের মত তাকিয়ে আছি।
আম্মা।। মাছে কি ডিম হইছে?
আম্মা।। ডিমগুলা কি অনেক বড়?
আম্মা।। এখন কি সব ভাজবা?
আম্মা।। আমি কিন্তু বড় ডিমটা খাব।
অই তুই চুপ থাকবি, বলেই এক ধমক। আমি বুঝেই পেলাম না এতে ধমক দেবার মত কি আছে।
হালকা বৃষ্টি, একটু বাতাস। আমার জন্য বিশাল ছাতা ধরে রাখা একটু কষ্টের। আবার এক হাতে হারিকেন। আবার একটু ভয় ও পাচ্ছি। শাঁকচুন্নিদের নাকি ইলিশ মাছের প্রতি ভীষণ লোভ।
আম্মা।। আমাদের এই বাড়িতে কি ভুত আছে?
তারা কি আমাদের দেখছে?
 একদম চুপ। আর একটা কথাও না। চুপ করে দাড়ায় থাক।
এইবার অপেক্ষা। কখন সাড়ে আট বাজবে। আব্বা বিটিভির খবর দেখা শেষ করেই খেতে বসবেন।
আমরা সবাই খেতে বসার সাথে সাথেই কারেন্ট আরেক দফা গেল।
সবার পাতেই একটা করে ইলিশ ভাজা, একটু ডিম সাথে মরিচ ভাজা। একটু ইলিশের তেল। গরম ধুয়া উঠা ভাত। অমৃত। মাথার উপর বৃষ্টির শব্দ। আলো আধারি। আমরা ভাই বোন সব একসাথে খাবার টেবিলে। কি সব দিন!
আমার পাতের মাছ ভাজা পাতে দেবার সাথে সাথেই শেষ। আব্বা খেয়াল করেই বললেন, ওরে আরেকটা মাছ দেও দেখি।
আম্মা ভীষণ বিরক্ত। অন্য তরকারি দিয়ে খাও।
আরে দেও। অমন কইর না।
সবার আগে ও মাছ খাইল কেমনে ? সবাইরে সমান ভাগ দিলাম না। ওর ভাত পইরা আছে। মাছ শেষ। দেখ মেয়ের অবস্থা।
আমি একটু লজ্জা পাচ্ছি, আবার ভাজা মাছের লোভ ছাড়তে পারছিনা।
আম্মা বেশ বিরক্ত হয়েই আরেকটা মাছ দিলেন। আমি মহা আনন্দে খাওয়া শুরু করেদিলাম।
দেখ মেয়ের আনন্দ। খা, মা। তোর জন্যই তো ইলিশ আনছি।
আব্বা।। আমি যখন চাকরি করব, তখন বেতন পেলেই খালি ইলিশ কিনব। আর সারাদিন ভেজে ভেজে খাব।
আব্বার হা হা হাসি, আর থামেই না। খাস। খুব ইলিশ ভাজা খাস।
আমি একটু লজ্জা পেলেও ঠিক করলাম। আমি আব্বাকেও আমার ইলিশ ভাজার ভাগ দিব।
এখন আমার ঘর ভর্তি ইলিশ। একটু বৃষ্টি হলেই মাছওয়ালাকে ফোন করে দিই। অনেক সুন্দর ইলিশ বাসায় এসে দিয়ে যায়।
খেয়ে সেই মজাও পাই না। তেমন খাই ও না। আর আব্বা...
আব্বা ।। আপনি কই ?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন