শনিবার, ১০ মে, ২০১৪

মা

আম্মা,আমারে কেন কোন জামাতেই সুন্দর লাগেনা ?
রইদে রইদে ঘুইরা চেহারা খানা হোঁদল কুতকুত বানায়া রাখছস, সুন্দর লাগব কেমনে?
আয়নায় নিজেকে দেখি আর ভাবি, আমি কেন আরেক টু সুন্দর হলাম না! কলি যাই পরে, কত সুন্দর লাগে। আর আমি, ধুর!
আম্মা আমাকে এক টুও আদর করেন না, এটা ভেবেই বড় হচ্ছিলাম। এটাই যেন স্বাভাবিক। মায়েরা যে আলাদা ভাবে আদর করে, এটা আমার জানাই ছিল না, অভাব ও বোধ করিনি কখনো।
ঝামেলা করলে মাইর আর প্লেট ভরে মজার মজার খাবার দিবে, এটাই তো আম্মা। সারাদিন উদয়ান্ত পরিশ্রম করা আমার মা পাঁচ বাচ্চাকে আদর করবে, সময় কই?
আদর করা যেন আম্মা জানেই না। আমার সোনা মানিকরে বলে কখনো চুমু খেয়েছে মনেই পড়েনা। এই দৃশ্যে মাকে কল্পনা করতেও হাসি পায়।
মায়ের আদর বলতে ছিল, খুব খুব খাওয়ানো। মজার মজার খাবার। আম্মার হাতে যেন সত্যিই জাদু আছে। কত কত লোকের মুখে যে আম্মার রান্নার প্রশংসা শুনেছি!
মা হয়ত ভাবত, খুব করে খাইয়ে দেয়াই আদর।আর ভাই বোনের মধ্যে আমি ছিলাম ও একটু বেশিই পেটুক।
ভোঁটকা, গোলগাল, রোদে ঘুরে লাল ধুসর চুলের এই আমি দেখতে ছিলাম ও উল্লেখ করার মত কালো। ভাই বোনের মধ্যে সবচেয়ে বদখত। না, ভুল। ভাইয়া ছিল আর ও কালো। কিন্তু ছেলে বলে কথা।
সারাদিনের পরিশ্রম শেষে বিকেলে মা বসত পাড়ার অ্যান্টিদের সাথে, সঙ্গে পরির মত সুন্দর করে সাজানো কলি।
আম্মা।। আমিও যাব।
অই, তুই বড় হইছস না? কলি ছোট, অরে নিয়া যাই। তুই খেলতে যা। নিল না।
আব্বার সাথে ভাইয়া বাজারে যাচ্ছে, আমি যাব বলতেই জানালো, মেয়ে বাবু বাজারে গিয়ে কি করবে? আসার সময় লজেন্স নিয়ে আসবে।বাসায় থাক।
আপাদের সাথে যেতে চাইলে আমি ছোট। এটা ছোটদের যাবার জায়গা না।
ধুর! আমি ছোট না বড়?

বাসে করে নানু বাড়ি যাচ্ছি। সবাই খুব খুশি। বাসে উঠেই দেখি, আমার জন্য কোন সিট নেয়া হয়নি। সবার সিট আছে। এমনকি আমার দুই বছরের বড় ভাইয়ার ও। আমার নেই। কলি তো মায়ের কোলে।
আমার যে সাইজ, তাতে করে আমাকে বেশিক্ষন কোলেও রাখা যায়না। কিছুক্ষন কোলে, কিছুক্ষন দাড়িয়ে। কি যে যন্ত্রণা!
তার উপর বাসে উঠলেই আমার বমি পায়, বাথরুম পায়।
বাস থেকে নেমে এবার রিক্সা। বসে পর পায়ের কাছে। রিকশাওয়ালার সিটের নিচের রড ধরে। কারন রিক্সা এই পথে মিলে কদাচিৎ। দুই রিক্সায় ৭ জনের ফ্যামিলি জায়গা করা সহজ কথা না। সবার জায়গা হয়, খালি আমার বেলায়!
যখনকার কথা লিখছি, তখন আমার মান সম্মান তেমন বিশেষ কোন বেপার হয়ে উঠেনি। পরীক্ষা শেষে দাদা বাড়ি, নানু বাড়ি যাচ্ছি, সেই বড়।
আম্মার আদর মনে করলেই মনে পরে, বিরাটএক হিন্দুয়ানী থালায় হরেক খাবার নিয়ে মুখে তুলে দিচ্ছে, আর ডলে ডলে গোসল করিয়ে ফর্সা করার চেষ্টা করছে। বাকি আর যা মনে পরে, তা হল মাইর।
কত মাইর যে আমি খেয়েছি! পুকুরে নাইতে নেমে ঘনটা দুয়েক পর লাল লাল চোখ করে মায়ের ডাকে পানি থেকে উঠে আসা। তারপর মা-ই-র।
দুপুরে না ঘুমিয়ে, মাছ ধরতে যাওয়া। মা-ই-র।
ঘুড়ির পেছনে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে দউরে যাওয়া। মা-ই-র।
নতুন নতুন ফ্রকে শাপলার দাগ লাগিয়ে ঘরে ফেরা। মা-ই-র।
প্রতিদিন স্যান্ডেল হারানো, প্যান্ট ছেঁড়া, দোকান থেকে কিছু আনতে দিলে সারা পাড়া ঘুরে ২ ঘণ্টা পর কি কিনতে বলেছে, ভুলে গিয়ে খালি হাতে ফিরে আসা। মা-ই-র।
ভাইয়ার সাথে ঝগড়া। অবশ্য ঝগড়া করলে মা দুজনকেই মারতেন। এই মাইর গুলিকেও বিশেষ কিছু মনে হত না, যেন খুব স্বাভাবিক বিষয়।

ক্লাস ফাইভে মান সম্মান বোধ তৈরি হতে থাকল। মাইর খাবার মত আর কাজ করিনা, ভুলে এক আধটা খেলে রাগ করে বসে থাকি। আব্বা এসে আহ্লাদ করে ডাকলে তবে সাড়া দেই। তার আগে আব্বা যেন আম্মাকে বকে সেই ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে নিই।
“ তুমি পারলা, এই ছোট্ট মেয়েটার গায়ে হাত তুলতে? খবরদার, আমার মেয়েদের তুমি কখনোই মারবানা বললাম”
এই ছিল আমার অতি প্রিয় ক’খানা শব্দ ।আম্মাকে জব্দ করা গেছে ভেবে বড় আনন্দ হত।
আব্বা অবশ্য বরাবরই আমাকে একটু বেশি আদর করতেন। আব্বার জন্য আমি ছিলাম সৌভাগ্য বতী। আমি ছুঁয়ে দিলেই নাকি সব হয়ে যায়। আমাকে বলতেন, তুই চাইবি, আর পাবিনা তা হবেনা, যা চাইবি তাই পাবি। আল্লাহ তোকে সৌভাগ্যের পরশপাথর দিয়ে আমার ঘরে পাঠিয়েছেন।এই কথাটা বলার জন্য বলা না, আব্বা মনে প্রানে বিশ্বাস করতেন। আমার স্বামীকে তিনি বহুবার বলেছেন এই কথা।

প্রথমবার মাকে ফেলে যখন ঢাকায় পড়তে চলে আসি,তখন মনে হয়, হায়! হায় সব কেন খালি খালি লাগে। বন্ধু বান্ধব, ভাই বোন কাউকে না, খালি আম্মার কথা মনে হয়। প্রতি সপ্তাহে বাড়ি গিয়ে হাজির হই। মা খুশি হন কিনা বুঝিনা। নির্লিপ্ত মা আমার টেবিল ভর্তি করে আমার প্রিয় খাবার রাধে। আমিও বলিনা, আম্মা, তোমার জন্য আমার খারাপ লাগে, মা তো বলেই না। আবার ঢাকায় ফিরি। বাসে বসে শুধু মায়ের জন্য হু হু করে কাঁদি।
আমার বিয়ের দিন দেখি মা আমার সারাদিন কাঁদে। সেই শুরু। মা এখন একটুতেই কাঁদে। বাড়ি গেলে খুশিতে কাঁদে, আমাদের ছোটো বেলার গল্প করতে গেলে কাঁদে, কিছু গিফট পেলে কাঁদে। মা দিবসে আমাদের ফোন পেলেও কাঁদে। আব্বার মৃত্যুর পর আম্মা যেন হুট করেই বুড়ো হয়ে গেলেন। পাহাড়ের মত কঠিন মা, আবেগহীন মা, এখন শিশুদের মত অভিমানী। বড্ড বেশি অভিমানী।
আমাকে এত মারতা কেন মা? জিজ্ঞেস করতেই অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, “খুব মারতাম নাকি? তুই তো অবশ্য বান্দর ও ছিলি খুব”।
আবার জিজ্ঞেস করি,
আম্মা, আমাকে কেন কোন জামাতেই সুন্দর লাগেনা?
এবার উত্তর আসে, “ কে বলে তোরে সুন্দর লাগেনা, কত্ত সুন্দর লাগে...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন