বুধবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৪

ট্রাই সাইকেল

ছোট বেলা থেকেই সাইকেলের প্রতি তীব্র দুর্বলতা। একটা ট্রাই সাইকেলের খুব শখ ছিল।কখনই বাবাকে বলিনি এই কথা। বললেই হয়ত কিনে দিতেন কিংবা দিতেন না। জানি না। এমন না বাবার কেনার সামর্থ্য ছিল না। ছিল। ভালোভাবেই ছিল। বাবা ব্যাংক ম্যানেজার। একটা ট্রাই সাইকেল কেনা হয়ত তার জন্য কোন বড় ব্যাপার হত না। তবু ও চাইনি।

ছোট বেলা থেকেই আমাদের শিখানো হয়েছে অপ্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য বায়না না ধরতে। খেলনা কেনা বিলাসিতা মাত্র। বড় ভাই বোন দের খেলনা দিয়েই খেলে কাটিয়েছি ছোট বেলাটা। সেই উত্তরাধিকার প্রাপ্ত খেলনার তালিকায় কোন ট্রাই সাইকেল ছিল না। কয়েকটা খালি স্নো ক্রিমের ডিব্বা, কিছু পুতুল, কয়েকটা গাড়ি। এই রকম কিছু খেলনা দিয়েই ছোট বেলাটা রঙিন।

এমনই এক দিনে আমাদের কলোনির পাশের বাসায় বদলি হয়ে এলেন থানা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। এক MBBS ডাক্তার। সাথে আমার ছোট বোনের বয়সি তাদের একমাত্র মেয়ে। সুন্দর। তবে আমার বোনের মত অত সুন্দর না। প্রথম টক্করেই আমি জিতলাম ভেবে সেই রকম এক চাহুনি দিয়ে বোনটাকে নিয়ে ওদের বাসার সামনে সারা বেলা ঘুর ঘুর করলাম। আর একটু পর পর অহংকারী এক চাহুনি দিয়ে ঘায়েল করার চেষ্টা করলাম।
ঘটনা ঘটল পরদিন বিকেল বেলা। হায়! হায়! কি সুন্দর এক গোলাপি সাইকেল!
তাতে বসা সেই পিচ্চি। তাকে ঠেলে ঠেলে নিয়ে ঘুরছে তাদের বাসার কাজের মেয়েটা। আর সেই পিচ্চি রাজ রানীর মত বসে আছে। লোভী বিড়ালের মত হা করে তাকিয়ে থাকলাম। কথা বলব কিনা ওদের সাথে বুঝতে পারছিলাম না। আমার বোনটা যেন একই চিন্তা করছিল।
আমরা কি ওদের সাথে খেলব, বুলি?
আরে নাহ!
ওরা আগে আসুক আমাদের সাথে খেলতে। চল, তুই আর আমি খেলি। নিজেদের ডিব্বা ডাব্বি নিয়েই খেলতেবসে গেলাম। আর একটু পর পর হা করে সাইকেল দেখি।
 এমন করেই সপ্তাহ পার। আমাদের কাজ হল বিকেল বেলা ঐ সাইকেল আর তার গতি বিধি দেখা। মাঠে খেলতে যাই না।
সন্ধ্যায় পিচ্চির মা এলেন, বাসা গোছগাছ নিয়ে ব্যাস্ত থাকায় এ ক'দিন আসতে পারেন নি। আমরা মহা খুশি। এইবার পিচ্চি আমাদের সাথে কথা বল্বে।ভাব হবে।
ফাজিল পিচ্চি, একটা কথা ও বল লনা।
কি আর করা! পরদিন বিকেলে আমরাই গেলাম। পিচ্চি আর তার সাইকেলের কাছে।
বলব, নাকি বলব না- করেও বলে ফেললাম। তোমাদের সাইকেলে আমাদের বসতে দেবে? এই ইট টু...
 না। না। খালাম্মা মানা করছে। ওরে সাইকেল থাইকা নামাইতে।
বদ কাজের মেয়ে। একটু বসতে ও দিল না। এক্তুপরেই পাশের বাসার কাজের মেয়েটা ঐ বদ কাজের মেয়েটা কে ডাকল আড্ডা দেবার জন্য।
এই বার!
আমি গিয়ে হাজির। তুমি জাও।কথা বল। আমি পিচ্চির সাইকেল ঠেলি। কিন্তু আমাকে একটু সাইকেলে ঘুরতে দিতে হবে।
আড্ডা পাগল মেয়ে সাথেসাথেই রাজি। আমার খুশি দেখে কে।
আমি সাথে সাথেই  সাইকেল ঠেলতে লেগে গেলাম। যত  সহজ ভেবেছিলাম তত সহজ না। রীতিমত ঘাম ছুটানো কষ্ট। তবুও সাইকেল চড়ার লোভে ঠেলে গেলাম।
আড্ডা শেষে মেয়েটা ফিরতেই বললাম, এই বার আমাকে বসতে দাও। আমার অনেক কষ্ট হইছে।সে মুখ ভেংচি কেটে বলল, তুমি যেই ভোঁটকা, সাইকেলে বসলে সাইকেল ভাইঙ্গা যাইব। বসন যাইব না।
ওমা! এই গুলা কি কথা! তুমি বলছ, আমারে বসতে দিবা। আমি মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টা করলাম। তখন ও হাঁপাচ্ছি।
না, দিব না। যাও।
তখনি আমার মাথায় বুদ্ধি এলো। তাইলে আমার ছোট বোন টারে বসতে দাও। ও তো চিকন, আর ছোট।
উসখুস করতে করতেই সে রাজি হল। আইচ্ছা।, তবে শুধু একটু চড়বা।
আমি তাতেও রাজি। খুশিতে চকচক করা দুই চোখ নিয়ে আমার ছোট বোনটা দৌড়ে হাজির।
ও কি ভীষণ খুশি। আমাকে বলল, তুই কেমনে বুঝলি আমি ও সাইকেলে উঠতে চাই? আমি হাসলাম। ভাবখানা এই, তোর জন্যই তো এত কষ্ট করলাম। ওর চোখে কৃতজ্ঞতা।
 যেই ও সাইকেলে বসতে যাবে, বাসার ভিতর থেকে আনটি ওদের ডাকল।
সন্ধ্যা হয়েছে, ঘরে এসো।
বদ কাজের মেয়েটা আমাদের দিকে একবার ও না তাকিয়ে সাইকেল টা নিয়ে বাসায় চলে গেল।
আমি মূর্তির মত দাড়িয়ে। এটা কি হল! আমার তখন ও সাইকেল থেলার কারনে বের হওয়া ঘামগুলো শুকায় নি। ছোট কপালের চুল গুলো ঘামে ভেজা। চোখ ফেতে কান্না আসছে। আমাদের কেন সাইকেল নাই? লজ্জায় ছোট বোনটার মুখের দিকে তাকাচ্ছিলাম না। আমার পরীর মত সুন্দর বোনটার ওর মত একটা সাইকেল কেন থাকবেনা?

ও আমার হাত ধরে বলে, চল বাসায় যাই। সাইকেলে উঠা লাগব না। দেখিস না, ওর সাইকেলের সিট টা কেমন হাগু কালারের। ইয়াক। চল, বাসায় চল।
আমি কিছুই বলিনি। বাসার সামনে এসেই ওকে বল লাম,
আমি তো ভালো ছাত্রী। ফাইভে দেখবি ঠিক বৃত্তি পাব। বৃত্তি পেলে সেই টাকা দিয়ে তোরে একটা সাইকেল আমি ঠিক কিনে দেব। এর চাইতে ও অনেক সুন্দর। হাগু কালারের সিট ওয়ালা না। তুই দেখিস... 

মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

ঝরা বকুল

মেয়ের পরীক্ষা। অনেকদিন পর স্কুলে গেলাম। যেহুতু অল্প সময়, ভাবলাম কিছুক্ষণ বসে থেকে মেয়েকে নিয়েই বাসায় ফিরি।

মুখটা দেখলেই বুঝা যায়, এক কালে তিনি মার মার কাট কাট সুন্দরী ছিলেন। এককালে কেন বলছি, হয়ত বছর সাতে'ক আগেই ছিলেন। বিশাল ভুঁড়ি, দ্বিতীয় চিবুক থাকার পরেও তাঁর রুপের ঝলক চোখে পরে। আরেক টু সামনে যে মহিলাটি বসা, তাঁর চোখ দুটিতে বুদ্ধির ঝিলিক ঠিকরে বেরুচ্ছে। মায়াময় মুখের মেয়েটি একটু পর পর টিস্যু দিয়ে ঘামে ভেজা মুখ মুছে নিচ্ছে। একটু ভালো করে খেয়াল করতেই দেখলাম, এখানে বসে থাকা মহিলাদের বয়স ২৫ থকে ৩৫ এর মধ্যেই বেশি। কেউ তাঁর এক সন্তানকে স্কুলে দিয়েছেন বছর দুয়েক হল।দুজন, তিন জন সন্তান স্কুলে পড়ে এমন মা ও আছেন। যদিও সংখ্যায় তুলনা মুলক ভাবে কম।
তবে সবাই মা। সবাই বসে আছেন ধানমণ্ডি লেকের গাছের ছায়ায় দল বেঁধে। সন্তানদের ছুটি হবার আগ পর্যন্ত এরা দল বেঁধে বসে থাকে। আড্ডা দেয়। খাওয়া দাওয়া করে, শপিং ও করে। এই মায়েদের জন্যই লেকের পাড়ে ছোট খাট এক মার্কেট জমে উঠেছে। স্কুল ছুটি হবার সাথে সাথেই মার্কেট ও ছুটি।

কি পাওয়া যায়না এখানে! জামা, জুতা, চুড়ি, আংটি, গয়না, ক্লিপ ব্যান্ড , গেঞ্জি, মোজা, ট্রাউজার, ব্যাডকভার ,হাড়িপাতিল, সব ধরনের সবজি, গরম মশলা, ফল, দুধ, পোলাওয়ের চাল, আচাড়, হজমি, ফুচকা, সিঙ্গাড়াচা, সেন্ডউইচ, সিগারেট, পিঠা, মুড়ি, পরোটা, ভাজি, ডিম, আর ও কত কি।
ডাইবেটিস পরীক্ষা করার ডাক্তার, মিনি পোর্টেবল জিম। সব আছে। খুঁজে দেখিনি। হয়ত বাঘের দুধ ও আছে।
মোট কথা সে এক বিশাল আয়োজন।

হাসি, আড্ডায় উচ্ছল মায়েদের পাশাপাশি কিছু পুরুষ মানুষের ও দেখা পাওয়া যায়। কিছু হয়ত বাচ্চাদের বাবা (?) কিন্তু অনেকেই না।বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে লেকের পাড়ে বসে থাকা বাবার সংখ্যা নেহায়েত কমই হবার কথা। সবারই কাজ থাকে। থাকারই কথা। ব্যাবসা, চাকুরি,... সবাই ব্যস্ত।
তবে কিছু পুরুষ আছেন যারা অনেক স্বাস্থ্য সচেতন(?)। খুব করে লেকের পাড়ে দৌড়ানো শেষে তারা তেলে চুপ চুপ করে ভাজা ৬ টা পরোটা, মালাই চিনি দেয়া চা, ডিম ভাজি পরোটা খেয়ে স্বাস্থ্য রক্ষা করেন এবং লেকের পাড়ে বসে থাকা মায়েদের দিকে ভীষণ মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকেন। ব্যাতিক্রম ও আছে বৈকি ।লেকের পাড় সবার জন্য উন্মুক্ত। সুন্দর জায়গা। সকাল বেলা আরও সুন্দর লাগে। যে কেউ আসতে পারে। খামোখা কিছু লোকের জন্য সবাইকে কষ্ট না দেই…:P
ফিরে আসি মায়েদের কথায়। আমার বরাবরই  একটু নাক সিটকানো ভাব ছিল এই সব মায়েদের নিয়ে। যখনই তাদের পাশে বসেছি, শুনতে পেয়েছি
জানেন ভাবী, আমার বুয়াটা না একটা বদ, একদিন এলে আরেকদিন খবর নাই।
ও মা! কি সুন্দর! ভাবী, কানের দুল টা কত নিল?
ও ভাবী, আমার শাশুড়ি টা না কি যে দজ্জাল! জীবন টা ভাঁজা ভাঁজা করে ফেলল।
দেখেন ভাবী এই ডায়মন্ডের রিং টা ও কিনে দিয়েছে। ৫০ পরল। কি যে পাগল একটা!
ঝিলিক দেখেছিলেন কাল? আমি মিস করলাম।

ওদের নিয়ে আমার নাক সিটকানো সেই থেকে শুরু। শাড়ি, গয়না, স্বামী, বুয়া, শাশুড়ি, বড়জোর কোন এক রান্নার রেসিপি নিয়ে এরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বক বক করতে পারে। কিভাবে পারে, ভেবে আসলেই অনেক অবাক হতাম।
স্কুলের এই দুই ঘণ্টা এদেরকে আমি বিভিন্ন রূপে দেখেছি। একদিন দেখলাম এক ভাবী বাসা থেকে জুস, খিচুরি,গরুর মাংস রান্না করে নিয়ে এসেছেন। সকালের আদ্দার ভাবীদের খাওয়া বেন বলে। সবাই মিলে গো গ্রাসে খাচ্ছে। কি আনন্দ! হাসি গুলো যেন কিশোরীদের হাসি। কেমন যেন খিল খিল শব্দ। অনেক অনেক প্রানবন্ত।
আজ অনেকদিন পর, অনেকদিন দিন পর আবারো আমি তাদের হাসি সুনলাম, দেখলাম। কিন্তু আজকের অনুভূতি একেবারেই ভিন্ন।
এই মায়েরা এই সময়টুকুতে সেই কিশোরী বেলায় ফিরে যায়। নিজেদের মত থাকে, আড্ডা দেয়,হাসে। মত কথা সংসারের ঘানি থেকে দুই ঘণ্টার মুক্তি। বুয়া, দারোয়ান, শাশুড়ি, রান্না কোন ঝামেলা নেই। শুধু নিজের জন্য সময়। বাসায় মন খারাপের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা। সংসারের বিরক্তি নিয়ে হাসি তামাশা। কুটনি শাশুড়ি দের পেট ভরে বকা ঝকা, নিজের জমানো টাকা থকে ইচ্ছেমত খরচ করা। ২৪ ঘণ্টা সংসারে সার্ভিস দেয়া এই মায়েরা নিজেদের এই দুই ঘণ্টা ভীষণ উপভোগ করে।
কৌতূহল নিয়ে দু চারজনকে পড়াশুনা নিয়ে জিজ্ঞেস করতেই জানাল, ওরা সবাই মাস্টার্স করা। আমার তখন আরও একবার চমকানোর পালা। কেউ কেউ তো একাউন্তিং, ম্যাথ, ইকনমিক্স, ফিজিক্স এর মত খিটমিটে সাবজেক্টে প্রথম শ্রেণি তে স্নাতকোত্তর।
আমার কেন যেন মনে হত, এইখানে আড্ডা দেয়া মহিলারা বেশির ভাগ গ্রাজুয়েট ই না। কত বড় বেকুব হলে এই টাইপের চিন্তা করতে পারি, ভেবেই লজ্জায় লাল হয়ে গেলাম।
লজ্জা পর্যন্ত থাকলে বেঁচে যেতাম। বিষয়গুলো কষ্টে রুপ নিল যখন জানলাম পরিবার তথা বাচ্চাদের সময় দেয়ার জন্যই তিনি আজ নিজেকে হারিয়ে অমুকের মা…. অমুক ভাবী।
তাঁর পরিবার হয়ত ভেবেছে বাহিরে কিছু করার চাইতে বাচ্চাদের সময় দেয়া বেশি গুরুত্ত পূর্ণ। কিংবা তাঁর নিজের ই হয়ত মনে হয়েছে ক্যারিয়ার সামলে বাচ্চাকে ভালভাবে মানুষ করা সম্ভব না। কিংবা quality time and quantitive time ব্যাপারটা হয়ত তাঁর স্বামীকে বুঝানো যায়নি। কিংবা স্বামীর পরিবারকে। নিজের পরিবারের চাইতে ক্যারিয়ারকে বড় করে ভাববে। এই রকম মেয়ে বাংলাদেশে অন্তত দুর্লভ। সবার আগে পরিবার, মেয়েরা এই জেনেই বড় হয়। এই ধারনা তাদের রক্তে মিশে গেছে।
অথচ আমি চোখ বন্ধ করেই বলে দিতে পারি কি সুন্দর একটা ক্যারিয়ার থাকতে পারত এখানকার প্রতিটা মায়ের। অসামান্য মেধা যা শুধুমাত্র সন্তান লালন আর রান্নায় খরচ হচ্ছে, সে চাইলেই পারত তাঁর জন্য আনন্দময় অন্য একটা জগত খুঁজে নিতে। কর্পোরেট লেডি, ব্যাংকার, শিক্ষিকা, ব্যবসায়ি, যে কোন জায়গায় সে চাইলেই নিজেকে দেখতে পারত। তাঁর সে মেধা, যোগ্যতা সবই আছে, ছিল।
কেন এভাবে বেঁছে নিতে বলা হয়, ক্যারিয়ার কিংবা পরিবার? দু’য়ের একটাকে। কখনো কি কেউ শুনেছে ডান চোখ চাই নাকি বাম চোখ এমন প্রশ্ন? দুটো চোখে problem কোথায়?
এক সাথে পরিবার আর ক্যারিয়ার... থাক, একটু বেশি চাওয়া হয়ে যাচ্ছে।
কোন এক ভাবীকে জিগ্যেস করেছিলাম, এভাবে বুয়েত পাশ মেয়ে ক্যারিয়ার ছেড়ে এখানে লেকের পাড় কি করছে?
আড্ডায় ব্যস্ত ঝলমলে কাপড় পরা ভাবীর চোখগুলোতে একটু যেন বিষণ্ণতা উকি দিয়ে গেল। বড় একটা দীর্ঘ শ্বাস ও মনে হয় কানে বাজল।
নইলে কি সন্তান মানুষ হবে? বলেই হাসলেন। আরও জানালেন তাঁর মেয়ে বরাবরই ফার্স্ট হয়।
আপনার মতই মেধাবী হয়েছে, বলতেই একটু লজ্জা পেলেন।
আমার কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিয়ে তিনি জানালেন তাঁর husband ও নাকি বুয়েট পাশ। ক্লাসমেট বিয়ে করেছেন। আর সবসময় তিনি তাঁর husband এর চেয়ে বেশি নাম্বার পেতেন।
বাহ! মেয়েত মেধাবী হবেই। বাবা মা ভীষণ মেধাবী যে।
ভাইয়া কি করেন?
ওর নিজের একটা ফার্ম আছে।
আমার কেন জানি কষ্টে বুকটা ভেঙ্গে যাচ্ছিল। উঠে চলে এলাম। খুব ইচ্ছে হচ্ছিল তাকে কয়েকটা কথা বলি। বলা হয়নি। যেই সাজানো সুখ নিয়ে তিনি আছেন, টা যদি নড়বড়ে হয়ে যায় সেই ভয়ে।
যা বলতে চেয়েও পারিনি-

মেয়েকে এভাবে সময় দেয়াতে মেয়ে যে একটা “জুয়েল” হয়ে উথবে তাতে সন্দেহ কি। সে অবশ্যই তাঁর মেধা দিয়ে জায়গা করে নিবে তাঁর বাবা মায়ের মতই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভালো রেজাল্ট নিয়েই বেরুবে।
ভাবী নিশ্চয় তা চাইবেন, চাইছেন। সে জন্যই তো তাঁর এত কষ্ট করা। নিজের ক্যারিয়ার ছেড়ে দেয়া।কিন্তু খেলা জমবে তখনই, যখন তাঁর এই “জুয়েল” মেয়ে আগামি ২৫ বছর পরে ঠিক এখানে তাঁর কন্যার জন্য অপেক্ষা করবে, তাঁর নিজের ক্যারিয়ার বাদ দিয়ে।
একজন মা হিসেবে তাঁর তখন কেমন লাগবে, যে মেয়ের জন্য নিজেকে হারিয়ে ফেলা, সেই মেয়ে যদি তাঁর মেয়ের জন্য নিজেকে হারায়। তাঁর মেয়ের জীবনটাও যদি তাঁর মতো হয়। সোনা দানায় মোড়ানো এক সংসারের গিন্নি।তিনি কি খুশি হবেন? তাঁর কি হবার কথা?

সব বাদ-
ভাবী আপনার নিজের মা কেমন আছেন? তিনি কি খুশি?
আপনার নিজের মেয়ের সুখ চাইতে গিয়ে আপনার মায়ের জীবন, সাধনাকে কি আপনি অসম্মান করলেন না?

কথা গুলো না বলে হয়ত ভালোই করেছি, কি বলেন???   


বুধবার, ২৭ আগস্ট, ২০১৪

মুদিতা

মুদিতা
একজন মানুষ কতখানি মানুষ হয়ে উঠেছে, তা বোঝার জন্যে একটা দারুণ টেস্ট আছে-- অব্যর্থ টেস্ট। এর নাম ‘মুদিতা’। মুশকিল হলো এই পরীক্ষাটি কেবল ব্যক্তি নিজেই নিজেরবেলায় করতে পারে, কেউই অন্যের ক্ষেত্রে পারে না।
প্রায় বছর দশেক আগে বৌদ্ধ ধর্মের উপর অতি সামান্য কিছু পড়াশোনা করতে গিয়ে যখন এই বিষয়টি প্রথম জানতে পারলাম, দেখলাম মানুষ হিসেবে আমার অবস্থান এতটাই লজ্জাজনক যে, এ নিয়ে কথা বলাও আমাকে মানাত না। ধীরে ধীরে অভ্যাস করতে শুরু করলাম, এখন মোটামুটি সন্তোষজনক পর্যায়ে আছি বলেই মনে করছি।
এবারে বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করি।
‘চার ব্রহ্মবিহার’ বলে বৌদ্ধ ধর্মে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আছে। এই চারটি ব্রহ্মবিহার হলোঃ মৈত্রী, করুণা, মুদিতা এবং উপেক্ষা। আমি এখানে শুধু মুদিতার ব্যাপারটি বলবো। মুদিতা হলো, অন্যের সুখে সুখি হওয়া। অন্যের যেকোনো ভালো, যশ, খ্যাতি, ধন-সম্পদ, ঐশ্বর্য, রূপের সৌন্দর্য, যোগ্যতা, সৌভাগ্য, উন্নতি, ইত্যাদি দেখে নিজের মনের মধ্যেও তৃপ্তি, শান্তি বা সুখ অনুভব করাই হলো মুদিতা। কাজটি যে কতো বড় কঠিন, তা সহজেই অনুমেয়। একটি উদাহরণ দিয়ে আরও পরিস্কার করার চেষ্টা করছি।
ধরা যাক, আপনার এক প্রতিবেশী (বা সাবেক বন্ধু) আপনার ঘোরতর শত্রু। হঠাৎ কোনো কারণে আপনার সেই প্রতিবেশীর বাড়িতে কোনো এক রাতে ভয়ানক অগ্নিকাণ্ড ঘটে গেল। এবং সেই অগ্নিকাণ্ডে আপনার ঐ প্রতিবেশীর বৃদ্ধ বাবা, বৃদ্ধা মা, স্ত্রী, কলেজ-পড়ুয়া এক পুত্র এবং পাঁচ বছর বয়সী এক কন্যা অগ্নিদগ্ধ হয়ে নৃশংসভাবে মারা গেল। আপনি যদি প্রমাণিত জানোয়ার না হন, তবে ঐ ঘটনায় আপনি যে কষ্ট অনুভব করবেন, তা আদৌ লোক-দেখানো নয়। ওটা সত্যিকার দুঃখবোধ। অথবা ধরা যাক, এতো সব বড় ঘটনা নয়, আপনার ঐ প্রতিবেশী হঠাৎ তার ছোট ব্যবসায় এতটাই হোঁচট খেয়েছে যে, তার চার ছেলে-মেয়ের লেখাপড়াই বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি, এক্ষেত্রেও আপনার দুঃখবোধটা আন্তরিকই হবে, লোক-দেখানো নয়। আমার এই উদাহরণের অর্থ, অন্যের দুঃখে দুঃখ বোধ করাটা আদৌ কঠিন কোনো কাজ নয়, তা আপনি অন্যের সেই দুঃখ দূর করার চেষ্টা করেন বা না-করেন।
কিন্তু ব্যাপারটি যদি উল্টো হয় ? ধরা যাক, আপনার এক সাধারণ প্রতিবেশী (বা বন্ধু), যে কিনা কখনই আপনার শত্রু নয় (অন্তত ছিল না), একের পর এক উন্নতির চমক দেখিয়েই চলেছে। ব্যবসায় উন্নতি চোখে পড়ছে, একটি সুন্দর ডিজাইনের চারতলা বাড়ির কাজে হাত দিয়েছে, বড় মেয়েটার বিয়ের কথা চলছে এক বনেদী পরিবারের ভদ্র ডাক্তার ছেলের সাথে, এবার স্কলারশিপ নিয়ে মেজ ছেলেটা যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছে, ছোট ছেলেটি বুয়েটে চান্স পেয়েছে, ইত্যাদি (এতগুলো এক সঙ্গে না হোক, ধরুন দু’একটি কম হলোই বা)। আপনি কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন, এতে আপনি কতটুকু সুখ অনুভব করেন?
যতটুকু সুখ অনুভব করবেন, আপনি ততটুকু ‘সাচ্চা’ মানুষ। আর যদি ফলাফল শূন্য হয় ? ............ থাক।
বৌদ্ধ ধর্ম (তথা শ্রী গৌতম বুদ্ধ) অন্যের দুঃখে দুঃখী হওয়ার এই বিষয়টির নাম দিয়েছে ‘করুণা’। শব্দটি পরিচিত, তাই মানে বুঝতেও অসুবিধা হয় না। পদার্থ বিজ্ঞানে কোনো পদার্থের বিকর্ষণই তার চুম্বকত্বের নিশ্চিৎ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হয়। মানুষের বেলায় আমার ধারণা, মানুষের ভেতরের ‘সাচ্চা’ মানুষটির নিশ্চিৎ পরীক্ষা ‘মুদিতা’, কোনোক্রমেই ‘করুণা’ নয়।
বি.দ্র.-- অন্যান্য ধর্ম বা সমাজ-ব্যবস্থায়ও অন্যের সুখে বা দুঃখে, যথাক্রমে সুখী বা দুঃখী হতে বলেছে। কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মের মতো এতো সুনির্দিষ্টভাবে পরিস্থিতিগুলোর সুনির্দিষ্ট নামকরণের মাধ্যমে উপস্থাপন করার ব্যাপারটি এখনও অন্য কোথাও আমার চোখে পড়ে নি।
পুনশ্চঃ আমার এক কাছের বন্ধু বহুদিন পর আজ ফোন করেছিল। ওদের আর্থিক অবস্থা ছিল দুঃখজনকভাবে বর্ণনাতীত। আজ জানলাম, ও ওর এক দূর সম্পর্কের লতায়-পাতায় আত্মীয়ের মাধ্যমে রাশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে কয়েক বছর আগে। এখন ওদের একটি ছোট দোতলা বাড়ি হয়েছে, মাঠে কিছু ধানী জমি কিনেছে, বড় ভাইকে একটি দোকান করে দিয়েছে, বাপকে আর পরের দোকানে মজুর খাটতে হয় না। কথাগুলো বলতে বলতে ও কেঁদে ফেলল। আমার চোখেও পানি এলো। ওকে আর বলতে পারলাম না, এমন স্বর্গীয় আনন্দ কতকাল পাই নি রে, বন্ধু ! 

শনিবার, ৩১ মে, ২০১৪

ইলিশ ভাঁজা

 এমনি কোন এক বর্ষায় অফিস শেষে সন্ধ্যায় বাবা ফিরলেন ২ টা ইলিশ মাছ হাতে। প্রায় কাক ভেজা হয়ে। আমরা তখন সবে পড়তে বসেছি। কারেন্ট নাই। ঝড় হলে কারেন্ট থাকার প্রশ্নই উঠেনা। হারিকেনের মিট মিট আলো। একটু পর পর সলতের আঁচ বাড়াতে হয়। এ টেবিলে আমি ভাইয়া আর পিচ্ছি বোনটা। একটু পড়ি, একটু মারামারি করি। মোমবাতি থাকলে আগুনের মধ্যে দিয়ে কে কয় বার আঙ্গুল আনা নেয়া করতে পারে, সেই খেলা ও চলে। আকাশে একটু পরপর গর্জন শোনা যায়। একটু বোধ হয় বাতাস ও ছিল। আম্মা রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে মাছ দুখানা দেখলেন।
এই ভর সন্ধ্যায়, ঝড় বৃষ্টিতে মাছ কুটার ঝামেলা নেহায়েত কম হবার কথা না। আব্বা মাছ দু’খানা মায়ের হাতে ধরিয়ে দিয়েই বললেন। খুব করে ভাজত দেখি। বলেই কাপড় পালটাতে চললেন।
মায়ের রাগ তখন কে দেখে। রাগে গজ গজ করতে করতে মাছ দুখানা নিয়ে কল পারে ছুটলেন। সাথে আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন। মাথার উপর ছাতা ধরে রাখার জন্য। আম্মা মাছ ধুচ্ছেন, আর আমি লোভী বিড়ালের মত তাকিয়ে আছি।
আম্মা।। মাছে কি ডিম হইছে?
আম্মা।। ডিমগুলা কি অনেক বড়?
আম্মা।। এখন কি সব ভাজবা?
আম্মা।। আমি কিন্তু বড় ডিমটা খাব।
অই তুই চুপ থাকবি, বলেই এক ধমক। আমি বুঝেই পেলাম না এতে ধমক দেবার মত কি আছে।
হালকা বৃষ্টি, একটু বাতাস। আমার জন্য বিশাল ছাতা ধরে রাখা একটু কষ্টের। আবার এক হাতে হারিকেন। আবার একটু ভয় ও পাচ্ছি। শাঁকচুন্নিদের নাকি ইলিশ মাছের প্রতি ভীষণ লোভ।
আম্মা।। আমাদের এই বাড়িতে কি ভুত আছে?
তারা কি আমাদের দেখছে?
 একদম চুপ। আর একটা কথাও না। চুপ করে দাড়ায় থাক।
এইবার অপেক্ষা। কখন সাড়ে আট বাজবে। আব্বা বিটিভির খবর দেখা শেষ করেই খেতে বসবেন।
আমরা সবাই খেতে বসার সাথে সাথেই কারেন্ট আরেক দফা গেল।
সবার পাতেই একটা করে ইলিশ ভাজা, একটু ডিম সাথে মরিচ ভাজা। একটু ইলিশের তেল। গরম ধুয়া উঠা ভাত। অমৃত। মাথার উপর বৃষ্টির শব্দ। আলো আধারি। আমরা ভাই বোন সব একসাথে খাবার টেবিলে। কি সব দিন!
আমার পাতের মাছ ভাজা পাতে দেবার সাথে সাথেই শেষ। আব্বা খেয়াল করেই বললেন, ওরে আরেকটা মাছ দেও দেখি।
আম্মা ভীষণ বিরক্ত। অন্য তরকারি দিয়ে খাও।
আরে দেও। অমন কইর না।
সবার আগে ও মাছ খাইল কেমনে ? সবাইরে সমান ভাগ দিলাম না। ওর ভাত পইরা আছে। মাছ শেষ। দেখ মেয়ের অবস্থা।
আমি একটু লজ্জা পাচ্ছি, আবার ভাজা মাছের লোভ ছাড়তে পারছিনা।
আম্মা বেশ বিরক্ত হয়েই আরেকটা মাছ দিলেন। আমি মহা আনন্দে খাওয়া শুরু করেদিলাম।
দেখ মেয়ের আনন্দ। খা, মা। তোর জন্যই তো ইলিশ আনছি।
আব্বা।। আমি যখন চাকরি করব, তখন বেতন পেলেই খালি ইলিশ কিনব। আর সারাদিন ভেজে ভেজে খাব।
আব্বার হা হা হাসি, আর থামেই না। খাস। খুব ইলিশ ভাজা খাস।
আমি একটু লজ্জা পেলেও ঠিক করলাম। আমি আব্বাকেও আমার ইলিশ ভাজার ভাগ দিব।
এখন আমার ঘর ভর্তি ইলিশ। একটু বৃষ্টি হলেই মাছওয়ালাকে ফোন করে দিই। অনেক সুন্দর ইলিশ বাসায় এসে দিয়ে যায়।
খেয়ে সেই মজাও পাই না। তেমন খাই ও না। আর আব্বা...
আব্বা ।। আপনি কই ?

শনিবার, ১০ মে, ২০১৪

মা

আম্মা,আমারে কেন কোন জামাতেই সুন্দর লাগেনা ?
রইদে রইদে ঘুইরা চেহারা খানা হোঁদল কুতকুত বানায়া রাখছস, সুন্দর লাগব কেমনে?
আয়নায় নিজেকে দেখি আর ভাবি, আমি কেন আরেক টু সুন্দর হলাম না! কলি যাই পরে, কত সুন্দর লাগে। আর আমি, ধুর!
আম্মা আমাকে এক টুও আদর করেন না, এটা ভেবেই বড় হচ্ছিলাম। এটাই যেন স্বাভাবিক। মায়েরা যে আলাদা ভাবে আদর করে, এটা আমার জানাই ছিল না, অভাব ও বোধ করিনি কখনো।
ঝামেলা করলে মাইর আর প্লেট ভরে মজার মজার খাবার দিবে, এটাই তো আম্মা। সারাদিন উদয়ান্ত পরিশ্রম করা আমার মা পাঁচ বাচ্চাকে আদর করবে, সময় কই?
আদর করা যেন আম্মা জানেই না। আমার সোনা মানিকরে বলে কখনো চুমু খেয়েছে মনেই পড়েনা। এই দৃশ্যে মাকে কল্পনা করতেও হাসি পায়।
মায়ের আদর বলতে ছিল, খুব খুব খাওয়ানো। মজার মজার খাবার। আম্মার হাতে যেন সত্যিই জাদু আছে। কত কত লোকের মুখে যে আম্মার রান্নার প্রশংসা শুনেছি!
মা হয়ত ভাবত, খুব করে খাইয়ে দেয়াই আদর।আর ভাই বোনের মধ্যে আমি ছিলাম ও একটু বেশিই পেটুক।
ভোঁটকা, গোলগাল, রোদে ঘুরে লাল ধুসর চুলের এই আমি দেখতে ছিলাম ও উল্লেখ করার মত কালো। ভাই বোনের মধ্যে সবচেয়ে বদখত। না, ভুল। ভাইয়া ছিল আর ও কালো। কিন্তু ছেলে বলে কথা।
সারাদিনের পরিশ্রম শেষে বিকেলে মা বসত পাড়ার অ্যান্টিদের সাথে, সঙ্গে পরির মত সুন্দর করে সাজানো কলি।
আম্মা।। আমিও যাব।
অই, তুই বড় হইছস না? কলি ছোট, অরে নিয়া যাই। তুই খেলতে যা। নিল না।
আব্বার সাথে ভাইয়া বাজারে যাচ্ছে, আমি যাব বলতেই জানালো, মেয়ে বাবু বাজারে গিয়ে কি করবে? আসার সময় লজেন্স নিয়ে আসবে।বাসায় থাক।
আপাদের সাথে যেতে চাইলে আমি ছোট। এটা ছোটদের যাবার জায়গা না।
ধুর! আমি ছোট না বড়?

বাসে করে নানু বাড়ি যাচ্ছি। সবাই খুব খুশি। বাসে উঠেই দেখি, আমার জন্য কোন সিট নেয়া হয়নি। সবার সিট আছে। এমনকি আমার দুই বছরের বড় ভাইয়ার ও। আমার নেই। কলি তো মায়ের কোলে।
আমার যে সাইজ, তাতে করে আমাকে বেশিক্ষন কোলেও রাখা যায়না। কিছুক্ষন কোলে, কিছুক্ষন দাড়িয়ে। কি যে যন্ত্রণা!
তার উপর বাসে উঠলেই আমার বমি পায়, বাথরুম পায়।
বাস থেকে নেমে এবার রিক্সা। বসে পর পায়ের কাছে। রিকশাওয়ালার সিটের নিচের রড ধরে। কারন রিক্সা এই পথে মিলে কদাচিৎ। দুই রিক্সায় ৭ জনের ফ্যামিলি জায়গা করা সহজ কথা না। সবার জায়গা হয়, খালি আমার বেলায়!
যখনকার কথা লিখছি, তখন আমার মান সম্মান তেমন বিশেষ কোন বেপার হয়ে উঠেনি। পরীক্ষা শেষে দাদা বাড়ি, নানু বাড়ি যাচ্ছি, সেই বড়।
আম্মার আদর মনে করলেই মনে পরে, বিরাটএক হিন্দুয়ানী থালায় হরেক খাবার নিয়ে মুখে তুলে দিচ্ছে, আর ডলে ডলে গোসল করিয়ে ফর্সা করার চেষ্টা করছে। বাকি আর যা মনে পরে, তা হল মাইর।
কত মাইর যে আমি খেয়েছি! পুকুরে নাইতে নেমে ঘনটা দুয়েক পর লাল লাল চোখ করে মায়ের ডাকে পানি থেকে উঠে আসা। তারপর মা-ই-র।
দুপুরে না ঘুমিয়ে, মাছ ধরতে যাওয়া। মা-ই-র।
ঘুড়ির পেছনে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে দউরে যাওয়া। মা-ই-র।
নতুন নতুন ফ্রকে শাপলার দাগ লাগিয়ে ঘরে ফেরা। মা-ই-র।
প্রতিদিন স্যান্ডেল হারানো, প্যান্ট ছেঁড়া, দোকান থেকে কিছু আনতে দিলে সারা পাড়া ঘুরে ২ ঘণ্টা পর কি কিনতে বলেছে, ভুলে গিয়ে খালি হাতে ফিরে আসা। মা-ই-র।
ভাইয়ার সাথে ঝগড়া। অবশ্য ঝগড়া করলে মা দুজনকেই মারতেন। এই মাইর গুলিকেও বিশেষ কিছু মনে হত না, যেন খুব স্বাভাবিক বিষয়।

ক্লাস ফাইভে মান সম্মান বোধ তৈরি হতে থাকল। মাইর খাবার মত আর কাজ করিনা, ভুলে এক আধটা খেলে রাগ করে বসে থাকি। আব্বা এসে আহ্লাদ করে ডাকলে তবে সাড়া দেই। তার আগে আব্বা যেন আম্মাকে বকে সেই ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে নিই।
“ তুমি পারলা, এই ছোট্ট মেয়েটার গায়ে হাত তুলতে? খবরদার, আমার মেয়েদের তুমি কখনোই মারবানা বললাম”
এই ছিল আমার অতি প্রিয় ক’খানা শব্দ ।আম্মাকে জব্দ করা গেছে ভেবে বড় আনন্দ হত।
আব্বা অবশ্য বরাবরই আমাকে একটু বেশি আদর করতেন। আব্বার জন্য আমি ছিলাম সৌভাগ্য বতী। আমি ছুঁয়ে দিলেই নাকি সব হয়ে যায়। আমাকে বলতেন, তুই চাইবি, আর পাবিনা তা হবেনা, যা চাইবি তাই পাবি। আল্লাহ তোকে সৌভাগ্যের পরশপাথর দিয়ে আমার ঘরে পাঠিয়েছেন।এই কথাটা বলার জন্য বলা না, আব্বা মনে প্রানে বিশ্বাস করতেন। আমার স্বামীকে তিনি বহুবার বলেছেন এই কথা।

প্রথমবার মাকে ফেলে যখন ঢাকায় পড়তে চলে আসি,তখন মনে হয়, হায়! হায় সব কেন খালি খালি লাগে। বন্ধু বান্ধব, ভাই বোন কাউকে না, খালি আম্মার কথা মনে হয়। প্রতি সপ্তাহে বাড়ি গিয়ে হাজির হই। মা খুশি হন কিনা বুঝিনা। নির্লিপ্ত মা আমার টেবিল ভর্তি করে আমার প্রিয় খাবার রাধে। আমিও বলিনা, আম্মা, তোমার জন্য আমার খারাপ লাগে, মা তো বলেই না। আবার ঢাকায় ফিরি। বাসে বসে শুধু মায়ের জন্য হু হু করে কাঁদি।
আমার বিয়ের দিন দেখি মা আমার সারাদিন কাঁদে। সেই শুরু। মা এখন একটুতেই কাঁদে। বাড়ি গেলে খুশিতে কাঁদে, আমাদের ছোটো বেলার গল্প করতে গেলে কাঁদে, কিছু গিফট পেলে কাঁদে। মা দিবসে আমাদের ফোন পেলেও কাঁদে। আব্বার মৃত্যুর পর আম্মা যেন হুট করেই বুড়ো হয়ে গেলেন। পাহাড়ের মত কঠিন মা, আবেগহীন মা, এখন শিশুদের মত অভিমানী। বড্ড বেশি অভিমানী।
আমাকে এত মারতা কেন মা? জিজ্ঞেস করতেই অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, “খুব মারতাম নাকি? তুই তো অবশ্য বান্দর ও ছিলি খুব”।
আবার জিজ্ঞেস করি,
আম্মা, আমাকে কেন কোন জামাতেই সুন্দর লাগেনা?
এবার উত্তর আসে, “ কে বলে তোরে সুন্দর লাগেনা, কত্ত সুন্দর লাগে...

মঙ্গলবার, ২৫ মার্চ, ২০১৪

দুপুর

আবার পানিটা কে কাঁপাল ? ধুত্তরি ! ফ্রকের বেল্টটা পানিতে পড়ার আর সময় পেল না, আর একটু...আর একটু বাকি। দু' দুটো মাছ একসাথে। চিংড়ির পোনাটা আবার লাফ দিবে নাতো? গতকাল একেবারে শেষ মুহূর্তে চিংড়িটা লাফিয়ে গেল।
হাতদুটো প্রায় পানির উপরে উঠিয়ে ফেলেছি। এখন শুধু পানিটুকু বের করে দেবার পালা। মাছ দুটো এখন ও আছে। উপুর হয়ে সমস্ত পুকুর ঘুরে এই পাড়ে কিছু মাছ দেখা গেছে। ভাইয়ার কাছ থেকে শিখেছি কেমন করে হাত দুটো এক করে বেড় দিয়ে আস্তে আস্তে  উপরে উঠাতে হয়। পানিটা সরে গেলে ঝুপ করে মাছ গুলো আটকানো লাগে। প্রথম প্রথম একদমই পারতাম না। শেষ মুহূর্তে মাছগুলু লাফিয়ে চলে যেত। এখন পারি। কাল ও দুইটা মাছ ধরেছি। একটা তো প্রায় ইঞ্চি দু'য়েক হবে। বিকেল বেলা ভাইয়াকে দেখাতে নিয়ে গিয়ে দেখি মরে ভেসে আছে। কত বড় গর্ত করে পানি দিয়ে জিইয়ে রাখলাম, তাও মরল! আজ কি হবে কে জানে!
যাহ্‌! চিংড়িটা আজও চলে গেল। তাতে কি, বেলে মাছটা এখন ও আছে। ধরেই ফেললাম। এখন পানিতে আটকানো। বালি দিয়ে চারপাশে বেড় দিতে দিতে মাছটা আবার মরে যাবেনা তো? ছেড়ে দিব? এতো কষ্ট করে ধরলাম...
দুপুর বেলা সবাই কেন যে ঘুমায়! আমার একটুও ভালো লাগেনা। বড়' পা না থাকলে ঘুমানোর ঝামেলা নেই। আম্মা ঘুমালে বাগানের দেয়াল ডিঙিয়ে  বের হওয়া ব্যাপার না। বড় আপা বড্ড যন্ত্রণা করে।সারাক্ষন পাহারা দেয়। বের হবার সুযোগ নাই।
আজ বের হতে অবশ্য ঝামেলা হয়নি। ফিরোজা কে ডাকব?খেলতে? ওরাও অবশ্য ঘুমায়। গিয়ে দেখবো নাকি? মনে হচ্ছে ঘুমুচ্ছে। জানালা অল্প ফাক করে দেখি আসলেই ঘুমুচ্ছে। দু'বার ডাকলাম, তাও উঠলো না। ওর মা দেখলে বকা লাগাবে।কই যাই? ভাল্লাগেনা...
আমেনাদের বাসায় যাওয়া যেতে পারে। ওরা দুপুরে ঘুমায় না, হাঁসের খাবারের জন্য শামুক টোকাতে যায়। যাব নাকি?
বেগুনি ফুলটা কি ফুল? আগেত দেখিনি। কাল রান্না বাটি খেলার সময় এই ফুলটা নেয়া লাগবে মনে করে।কি সুন্দর খাবার বানানো যাবে। কাউ কে দেখাব না। পাতাটা পিঠা বানানো যাবে। কি সুন্দর করে সাইড কাটা।
ভর দুপুরে রোদে ভীষণ গরম লাগছে। আকাশটা কি সুন্দর, এই মেঘ গুলোর কি মজা! কই যায় এরা? কোত্থেকে আসে?
মেঘ হলে দারুন হতো। দুপুরে আমার সাথে কেউ খেলেনা। আমার ভাল্লাগেনা। পুকুরে মাছ ধরেও মজা নাই।আমার সাথে কে খেলবে?কখন বিকেল হবে? 

শনিবার, ১৫ মার্চ, ২০১৪

ঢাকার 'হাটা বাবা" । রহস্য নাকি ভণ্ডামি?

আজ সকালেই ড্রাইভারের কাছে খবর শুনলাম, ঢাকায় হাটা বাবা নামে যে লোকটা হেঁটে বেড়াতো আজ দুদিন হয় মারা গেছে। আমিও বেশ কয়েকবার দেখেছি। ব্যস্ত রাস্তায় একদল লোক নিয়ে বয়স্ক এক লোক হেঁটে চলেছেন। ধুলি ধুসর গা, ময়লা, অনেকটা নোংরাই বলা চলে।
অনেক ধরনের মানুষ তার পেছনে পেছনে হাঁটত। ছেলে, বুড়ো, মহিলা, যুবক...অনেক মানুষ। তাদের মধ্যে প্রায় সবাই বিশ্বাস করত এই "হাটা বাবা"র কিছু আলাদা ক্ষমতা ছিল। তিনি নাকি অনেক কম কথা বলতেন, এবং হুট করেই একদিন কাউকে ডেকে বলতেন তোর মনের ইচ্ছা পুরন হবে। লোকজন তাতেই খুশি। তারা ভাবত উনি বললেই হবে।
এই হাটা বাবা নিয়ে লোকজনের বিরক্তি ও কম ছিল না। নোংরা গন্ধে কাছেই নাকি যাওয়া যেত না। তবুও তিনি হাটা বাবা। অনেকে পরম শ্রদ্ধায় তাকে স্মরণ ও করবেন।

প্রকৃতি অনেক রহস্য ধারন করে, সেটাই তার ধর্ম। মানুষ তার প্রাত্যহিক ঝামেলা থেকে মুক্ত হতে চায়, যখন হতাশা তাকে পেয়ে বসে, তখন সে বিশ্বাস করতে শুরু করে কোন এক অলৌকিক রহস্যময় কিছু তার সমাধান করে দেবে। এই প্রত্যাশায় সে যা পায় তাই খড় কুটোর মত আকরে ধরে।

 হাটা বাবা হয়ত তেমন ই এক আকাঙ্ক্ষার নাম। এমন একটা ময়লা লোকের  পেছনে এতো গুলো মানুষ কেন হাটে, আমার খুব জানতে ইচ্ছে হত। আসলেই কি কোন ক্ষমতা স্রস্টা তাকে দিয়েছেন?

জুলফিকার আলি হায়দার একসময় স্বাভাবিক মানুষ ছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। তার তিনপুত্রের কথা ও শুনা যায়। একসময় তিনি পীর হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকেন। গোসল ,নামায, স্বাভাবিক জীবন সব বাদ দিয়ে কেবল হেঁটে চলা... কেন হাঁটতেন? মানসিক বিকার নিয়ে কোন লোভী মানুষের বেবসার কারনে তার এই পীর খেতাব কিনা, তাই বা কে জানে! এতগুলা মানুষ, তাদের বুদ্ধি কোন পর্যায়ে? কেন তার অনুসারী? কোন ধর্ম তিনি মানতেন? কিভাবে মুক্তি? ইহ লৌকিক নাকি পর লৌকিক? কোন মুক্তি তিনি তার ভক্তদের দেবার আশ্বাস দিতেন?
ঢাকার রাস্তায় "হাটা বাবা"। ছবিঃ সংগৃহীত।

খুব খোঁজ খবর করার সুযোগ ও পাইনি। তার মৃত্যুতে কিছু লোকের খুব বেবসা হবে বুঝা যাচ্ছে।  কিন্তু সে কেন ভোগ  করেনি এই সম্পদ?
মানুষ কেন খুজে এই আধ্যাত্মবাদ?
কিভাবে পায় এর দেখা?
এই প্রশ্ন গুলো নতুন করে আবার উঁকি দিয়েছে আমার মনে।