রবিবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৪

সুধা পাগলী

প্রায় সব গ্রামেই একটা করে পাগল থাকে, পাগলি থাকে কমই। মান সম্মানের ভয়ে সবাই পাগলিকে গ্রামের বাইরে ছেড়ে দিয়ে আসে, ভাবটা এমন দূরে কিছু হলে আমাদের কি... চখের সামনে তো আর হচ্ছে না।
আমাদের এলাকায় একটা পাগলি ছিল, নাম সুধা। সবাই বলত ছুতা পাগলি। বয়স প্রায় ৪০আমাদের বাড়ির পাসেই তার ভাইয়ের বাড়ি ।বেচারা ভাই যত্ন নেবার চেষ্টা করত। পাগলি কি আর ঘরে থাকে! নিরীহ টাইপ পাগল। কাউকে মারতে দেখিনি। তার ভাই থাকায় দুষ্ট ছেলেপুলে তাকে তেমন জ্বালাত ও না।
মাঝে মাঝে পাগলী ভীষণ খেপত। ইচ্ছেমত গালাগালি করত।
প্রতিদিন আমাদের বাড়ি আসত। কারো সাথে কথা বলতনা। বসে থাকতো আমার মায়ের জন্য। মা খেতে দিলে সে খেত না। বলত আগে কাজ দে। প্রতিদিন আমাদের মাটির চুলা লেপে দিত। তারপর খেত।
হিন্দু মানুষ মুসলমানের বাড়িতে খাওয়া নিয়ে প্রথম প্রথম ঝামেলা ও ছিল। কিন্তু সে কারো বাড়িতেই কিছু খেত না। পরে তার ভাই বলত,
 দিদি।।যা পারেন খেতে দিয়েন, সারাদিন না খেয়ে থাকে।
 তারপর থেকে আর কেউ কিছু বলেনি।
একদিন খেয়াল করে দেখি অন্য সব পাগলের মত সেও যা পায়, তাই তার কোচরে ভরে। একটু পর পর চুলার ভেতরে মুখ ঢুকায় আর কথা বলে। মাকে বলতেই ঝাড়ি। পাগল কি করে টা নিয়ে তোমার গবেষণার দরকার কি?
আসলে মায়ের খারাপ লাগত ,সুধা কে কেউ কিছু বললেই।
একদিন দেখি মা জিজ্ঞেস করছে, হ্যাঁরে সুধা।। চুলায় তুই কার সাথে কথা বলিস?
দিদি।। ভিতরেই তো থাকে।
বের হতে বল।
না, হারিয়ে যাবে।
কি হারাবে?
সে।
কে?
যাই গো।
এমন করে কথা আর আগায় না। প্রায় দুপুরে আমি তাকে দেখি, এসে বসে আছে চুলার পারে, কি যেন বলে, সারাক্ষন।
পুরানো হিন্দু বাড়ি।  বিশাল বাড়ি। বাড়ি ভরতি ঝোপ ঝাড়। হাজারো গাছ। কিশোরী আমি দুপুরে একা একা ঘুরি।সবাই নাক ডেকে ঘুমোয়। আমার সব কৌতূহল জমে গিয়ে সুধাতে।
অই  সুধা। কি করিস?
চুলায় আগুন জ্বেলে দি।
অই, কথা বলিস না কেন?
কিছু খাবি? আম্মাত ঘুমায়।
আরে অই সুধা... কোন লাভ নেই। সুধা কোন উত্তর দেয়না। একদিন দেখি, চুলা লেপা কাঁদা পানি সে দকদক করে খাচ্ছে। ভালো পানি দিতেই কেমন যেন খেপে গেল।
এককালে সে ফর্সা ছিল, রূপের ছাপ এখনও চোখে পরে।ক্লান্ত। বিষণ্ণ চোখ। ঠাকুর দেবতার ধার ধারেনা।
সুধা কি খুজে, কাকে খুজে, চুলায়ই বা কেন? কে জানে। তার ভাইয়ের বউ কে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
কি জানিগ , আমি অতশত জানিনা। বিয়ার পর থিকাই দেখি সে পাগল। বিয়া হইছিল। পাগল তাই নিয়া আইছি।
 কউতুহল মিটে না।
গ্যাস এসেছে। চুলায় কাজ নাই। তাও সে প্রতিদিন চুলা লেপে। অন্য কোন বাড়ির চুলা না। শুধু আমাদের চুলা, নির্দিষ্ট একটা চুলা। মা চুলাটা ভাঙ্গতে দিল না। থাকনা, একটা চুলা। আমরা ততদিনে রান্নাঘর অন্য পাশে নিয়ে গেছি। সে এসে বসেই থাকে। দিলাম একদিন আগুন জালিয়ে, রান্না বাটি খেলবো। সে এসে দেখল, কিছুই বল্লনা।
পরদিন তার খোঁজ নাই। শীতের রাত। তার ভাই এসে হাযির। রাত ১১ টা। পাড়া গাঁয়ে শীতের রাত ১১ টা মানে অনেক রাত।
দিদি সুধা এসেছিল?
নাতো।
আহারে কই গেল, পাগলীটা। এই পর্যন্তই। আমরা ভুলে গেলাম।
পরদিন সকালে মা ওকে খুজে পেল আমাদের পুরানো রান্নাঘরে, চুলার পাড়ে। কুচিমুচি মেরে ঘুমিয়ে আছে।
রান্নাঘরে চাল, বেড়া কিছুই নেই, শুধু সুধার চুলাটুকু ছাড়া।
এই সুধা উঠ। উঠ।
গাঁয়ে হাত দিতেই মার চমকে উঠার পালা। ভীষণ জ্বর। খবর পাঠানো হল সুধার ভাইকে।
নিয়েও গেল। খায়না। জ্বর ও কমেনা। কথাওবলেনা।
পরীক্ষা ছিল, সুধাকে ভুলে গেলাম। পড়ার ঠেলায় জান শেষ, আর সুধা!!!

একদিন মা গেল দেখতে, হাড় জিরজিরে মানুষ, আরও হাড় জিরজিরে হয়ে গেছে। কথাও বলেনা। সারাক্ষন বির বির করে।
মা জিজ্ঞেস করল, সুধা কিছু খাবি? কেমন যেন ভাব লেশ হীন চাহনি। বিষণ্ণ।
মায়ের ভীষণ মন খারাপ।
পরদিন মায়ের অনেক কাজ। জংলা পরিষ্কার করাবে। এতো বড় বাড়ি, জঙ্গলে মায়ের বিরক্তি বাড়ে। সাহসি মা আমার ভুত, সাপ, কিছুই ভয় পায়না। কিন্তু এতো বড় বাড়িতে মায়ের বড় একলা লাগে।
কি মনে করে মা আবার চুলাটা পরিষ্কার করালেন, উদাসীকে বললেন, ভালো করে চুলাটা লেপে দেত।
কেমন হয়ে আছে চুলাতা।বেচারা সুধার চুলা!!
উদাসী বড় যত্ন করে লেপে দিল।
কয়েকদিন পর সুধা আবার হাযির। সে নাকি মা দেখে আসার পরদিন দুপুর থেকেই ভালো। উদাসির ধারনা, দুপুরে চুলা লেপার পর থেকে সে ভালো হয়ে গেছে।
খুব হাসলাম। উদাসীকে নিয়ে।
তবুও চুলাকে আর কেউ ঘাতালাম না। ওখানে তার কিছু মূল্যবান(?) সামগ্রী পাওা গেল। অনেক রকমের সুতা, সাথে কাপরের টুকরা, পিন, আয়না ভাঙ্গা। কি নেই। আবার ভুলে গেলাম।
ঢাকায় চলে এলাম পরতে।
একদিন মা ফোন করে জানালো ,
জানিস কাল না সুধা মরে গেল। চুপ মেরে গেলাম, কেমন জানি লাগ্ল।পুরান হাজার সৃতি চট করেই মনে পরে গেল।  যান্ত্রিক ঢাকার এই আমাকে অনেক বেশি মন খারাপ করিয়ে দিল, ছোট্ট এই খবরটা। সুধা আমার কেউ ছিল না, তবুও আমাদের বাড়ির একটা অংশ ছিল।

সুধার সাথে কি ছিল চুলার সম্পর্ক? কেঊ জানেনা। পুরানো হিন্দু বাড়িতে কিছু মিথ থাকে, আমাদের বাড়ির ও ছিল। কে মানে ওসব।
তবুও পাড়া প্রতিবেশীদের ভাষ্য, সুধার কেউ থাকত এখানে। কে ????
বাবা একবার এসব কথায় বিরক্ত হয়ে চুলা ভেঙ্গে দিয়েছিল।
সুধা কিছু বলেনি। পরদিন সে আবার চুলা বানাতে এসেছে। মা ওকে বাড়ির একপাশে চুলা বানিয়ে দিয়েছিল।
মাকে জিজ্ঞেস করলাম, মা সুধার চুলা কি আছে?
 মা জানালো
নারে, আম টোকাতে এসে কতগুলু বিচ্ছু চুলাটা ভেঙ্গে দিয়েছে।

সুধা নাকি হুট করেই মরে গেল...
প্রকৃতির সব রহস্য কি আমরা জানি????????