বুধবার, ২৭ আগস্ট, ২০১৪

মুদিতা

মুদিতা
একজন মানুষ কতখানি মানুষ হয়ে উঠেছে, তা বোঝার জন্যে একটা দারুণ টেস্ট আছে-- অব্যর্থ টেস্ট। এর নাম ‘মুদিতা’। মুশকিল হলো এই পরীক্ষাটি কেবল ব্যক্তি নিজেই নিজেরবেলায় করতে পারে, কেউই অন্যের ক্ষেত্রে পারে না।
প্রায় বছর দশেক আগে বৌদ্ধ ধর্মের উপর অতি সামান্য কিছু পড়াশোনা করতে গিয়ে যখন এই বিষয়টি প্রথম জানতে পারলাম, দেখলাম মানুষ হিসেবে আমার অবস্থান এতটাই লজ্জাজনক যে, এ নিয়ে কথা বলাও আমাকে মানাত না। ধীরে ধীরে অভ্যাস করতে শুরু করলাম, এখন মোটামুটি সন্তোষজনক পর্যায়ে আছি বলেই মনে করছি।
এবারে বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করি।
‘চার ব্রহ্মবিহার’ বলে বৌদ্ধ ধর্মে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আছে। এই চারটি ব্রহ্মবিহার হলোঃ মৈত্রী, করুণা, মুদিতা এবং উপেক্ষা। আমি এখানে শুধু মুদিতার ব্যাপারটি বলবো। মুদিতা হলো, অন্যের সুখে সুখি হওয়া। অন্যের যেকোনো ভালো, যশ, খ্যাতি, ধন-সম্পদ, ঐশ্বর্য, রূপের সৌন্দর্য, যোগ্যতা, সৌভাগ্য, উন্নতি, ইত্যাদি দেখে নিজের মনের মধ্যেও তৃপ্তি, শান্তি বা সুখ অনুভব করাই হলো মুদিতা। কাজটি যে কতো বড় কঠিন, তা সহজেই অনুমেয়। একটি উদাহরণ দিয়ে আরও পরিস্কার করার চেষ্টা করছি।
ধরা যাক, আপনার এক প্রতিবেশী (বা সাবেক বন্ধু) আপনার ঘোরতর শত্রু। হঠাৎ কোনো কারণে আপনার সেই প্রতিবেশীর বাড়িতে কোনো এক রাতে ভয়ানক অগ্নিকাণ্ড ঘটে গেল। এবং সেই অগ্নিকাণ্ডে আপনার ঐ প্রতিবেশীর বৃদ্ধ বাবা, বৃদ্ধা মা, স্ত্রী, কলেজ-পড়ুয়া এক পুত্র এবং পাঁচ বছর বয়সী এক কন্যা অগ্নিদগ্ধ হয়ে নৃশংসভাবে মারা গেল। আপনি যদি প্রমাণিত জানোয়ার না হন, তবে ঐ ঘটনায় আপনি যে কষ্ট অনুভব করবেন, তা আদৌ লোক-দেখানো নয়। ওটা সত্যিকার দুঃখবোধ। অথবা ধরা যাক, এতো সব বড় ঘটনা নয়, আপনার ঐ প্রতিবেশী হঠাৎ তার ছোট ব্যবসায় এতটাই হোঁচট খেয়েছে যে, তার চার ছেলে-মেয়ের লেখাপড়াই বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি, এক্ষেত্রেও আপনার দুঃখবোধটা আন্তরিকই হবে, লোক-দেখানো নয়। আমার এই উদাহরণের অর্থ, অন্যের দুঃখে দুঃখ বোধ করাটা আদৌ কঠিন কোনো কাজ নয়, তা আপনি অন্যের সেই দুঃখ দূর করার চেষ্টা করেন বা না-করেন।
কিন্তু ব্যাপারটি যদি উল্টো হয় ? ধরা যাক, আপনার এক সাধারণ প্রতিবেশী (বা বন্ধু), যে কিনা কখনই আপনার শত্রু নয় (অন্তত ছিল না), একের পর এক উন্নতির চমক দেখিয়েই চলেছে। ব্যবসায় উন্নতি চোখে পড়ছে, একটি সুন্দর ডিজাইনের চারতলা বাড়ির কাজে হাত দিয়েছে, বড় মেয়েটার বিয়ের কথা চলছে এক বনেদী পরিবারের ভদ্র ডাক্তার ছেলের সাথে, এবার স্কলারশিপ নিয়ে মেজ ছেলেটা যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছে, ছোট ছেলেটি বুয়েটে চান্স পেয়েছে, ইত্যাদি (এতগুলো এক সঙ্গে না হোক, ধরুন দু’একটি কম হলোই বা)। আপনি কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন, এতে আপনি কতটুকু সুখ অনুভব করেন?
যতটুকু সুখ অনুভব করবেন, আপনি ততটুকু ‘সাচ্চা’ মানুষ। আর যদি ফলাফল শূন্য হয় ? ............ থাক।
বৌদ্ধ ধর্ম (তথা শ্রী গৌতম বুদ্ধ) অন্যের দুঃখে দুঃখী হওয়ার এই বিষয়টির নাম দিয়েছে ‘করুণা’। শব্দটি পরিচিত, তাই মানে বুঝতেও অসুবিধা হয় না। পদার্থ বিজ্ঞানে কোনো পদার্থের বিকর্ষণই তার চুম্বকত্বের নিশ্চিৎ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হয়। মানুষের বেলায় আমার ধারণা, মানুষের ভেতরের ‘সাচ্চা’ মানুষটির নিশ্চিৎ পরীক্ষা ‘মুদিতা’, কোনোক্রমেই ‘করুণা’ নয়।
বি.দ্র.-- অন্যান্য ধর্ম বা সমাজ-ব্যবস্থায়ও অন্যের সুখে বা দুঃখে, যথাক্রমে সুখী বা দুঃখী হতে বলেছে। কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মের মতো এতো সুনির্দিষ্টভাবে পরিস্থিতিগুলোর সুনির্দিষ্ট নামকরণের মাধ্যমে উপস্থাপন করার ব্যাপারটি এখনও অন্য কোথাও আমার চোখে পড়ে নি।
পুনশ্চঃ আমার এক কাছের বন্ধু বহুদিন পর আজ ফোন করেছিল। ওদের আর্থিক অবস্থা ছিল দুঃখজনকভাবে বর্ণনাতীত। আজ জানলাম, ও ওর এক দূর সম্পর্কের লতায়-পাতায় আত্মীয়ের মাধ্যমে রাশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে কয়েক বছর আগে। এখন ওদের একটি ছোট দোতলা বাড়ি হয়েছে, মাঠে কিছু ধানী জমি কিনেছে, বড় ভাইকে একটি দোকান করে দিয়েছে, বাপকে আর পরের দোকানে মজুর খাটতে হয় না। কথাগুলো বলতে বলতে ও কেঁদে ফেলল। আমার চোখেও পানি এলো। ওকে আর বলতে পারলাম না, এমন স্বর্গীয় আনন্দ কতকাল পাই নি রে, বন্ধু !